Dhaka ০৯:৫০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
রূপগঞ্জে ‘আন্ডা রফিক’-এর সন্ত্রাস, জমি দখল ও অর্থপাচার দীর্ঘদিনের পলাতকতার শেষে নতুন উত্তেজনা ঈদগাঁও থানার এ এস আই অন্ত বড়ুয়া বেপরোয়া মিথ্যা জিডি নিয়ে তার বাণিজ্য মিতা সংবাদের প্রতিবাদ ভুয়া “প্রাচীন পিলার-কয়েন” ২য় পর্ব কৃষকলীগ নেতা মাকসুদ-সোহেল সিন্ডিকেটের শত কোটি টাকা প্রতারণা প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আওয়ামী দোসর শফিউল্লাহ আল মুনিরের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে ৬ হাজার লিটার ডিজেল জব্দ, ১২ পাচারকারী আটক ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় শুরু হচ্ছে টিকাদান কর্মসূচি ফায়ার সার্ভিসে পদ বাণিজ্যের অভিযোগ ৩ কোটি টাকায় পরিচালক পদ বাগানোর দাবি উপসচিব আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে দেওয়ানবাগ দরবার শরীফে আধ্যাত্মিকতার আড়ালে হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জরুরি নির্দেশনা

১০ পর্বের ১ম পর্ব *পিলার ও কয়েন চক্রের মূলহোতা ফরিদপুরের আওয়ামী নেতা আবদুস সোবহান*

ফরিদপুর জেলা আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগের সভাপতি আবদুস সোবহানকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে চলছে কথিত ‘পিলার’ ও ‘কয়েন’ ব্যবসার রমরমা প্রতারণা ফাঁদ। অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলেও এই প্রতারক চক্রের মূলহোতা সোবহানের দাপট কমেনি। ভুয়া দলিল এবং প্রাচীন ও মূল্যবান ধাতব বস্তুর প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীর মালিকদের কাছ থেকে লাখ থেকে শুরু করে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। ভুক্তভোগীদের দাবি, সোবহান বিভিন্ন দুর্লভ কয়েন ও পিলার সদৃশ বস্তু দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করতেন। প্রচার করতেন, এসব বস্তু বিদেশি ক্রেতাদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করে বিপুল মুনাফা করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে এসব তথাকথিত মূল্যবান বস্তু ছিল সাধারণ হাতে তৈরি ধাতব দ্রব্য, যার কোনো বাজারমূল্য নেই। এই মরীচিকার পেছনে ছুটে এখন নিঃস্ব হওয়ার পথে অনেক পরিবার।

এই প্রতারণার জালে আটকা পড়া ভুক্তভোগীদের তালিকায় রয়েছেন রাজিয়া সুলতানা বেবী, কিচেন গ্রুপের মালিক এমএ কাদের, এনার্জিপ্যাকের মালিক এনামুল হক চৌধুরী (খসরু), মো. মঈন বিশ্বাস, বেঙ্গল গ্রুপের মালিক আবুল খায়ের লিটু এবং ফেনীর বাসিন্দা মাসুদ উদ্দিন (চৌধুরী)। অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, সোবহান একেকজন ভুক্তভোগীকে ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে ফাঁদে ফেলেছেন। কখনো এককালীন বড় অঙ্কের টাকা, আবার কখনো ধাপে ধাপে অর্থ আদায় করছেন। ভুক্তভোগীরা জানান, শুরুতে সোবহানের রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের ওপর ভরসা করে তারা বিশ্বাস করেছিলেন যে তিনি পণ্যগুলো সঠিক উপায়ে বাজারজাত করতে পারবেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও এবং বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও তিনি কোনো অর্থ ফেরত দেননি।

প্রতারণার এই আঘাত শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং কেড়ে নিয়েছে প্রাণও। ভুক্তভোগী রাজিয়া সুলতানা বেবীর পরিবার বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটে নিমজ্জিত। রাজিয়া জানান, এই বিশাল আর্থিক ক্ষতির মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে তার বাবা ইউনুছ তালুকদারের স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং পরবর্তীতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাদের পরিবারের দাবি, কয়েন ও পিলার ব্যবসার ফাঁদই তাদের পারিবার ধ্বংসের মূল কারণ।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও কিচেন গ্রুপের মালিক এমএ কাদের জানান, সোবহান তাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পিলার ও কয়েন বিক্রি করে লভ্যাংশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ব্যবসায়িক আস্থা ও তার রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করলেও এখন সোবহানের আর কোনো হদিস মিলছে না। তিনি তার মূল টাকাও ফেরত পাননি। একইভাবে এনার্জিপ্যাকের মালিক এনামুল হক চৌধুরী (খসরু) জানান, সোবহান নিজেকে একটি আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের অংশ হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং অতীতে সফল লেনদেনের মিথ্যা উদাহরণ দিতেন। এই মিথ্যে বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে লেনদেনে জড়িয়ে তিনি এখন প্রতারিত।

অন্য এক ভুক্তভোগী মো. মঈন বিশ্বাস জানান, শুরুতে সোবহান নিয়মিত যোগাযোগ রাখলেও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পর ধীরে ধীরে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এখন তিনি দেখছেন তার ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। অভিযোগের তালিকায় থাকা বেঙ্গল গ্রুপের মালিক আবুল খায়ের লিটুর বিষয়ে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, দেশের এত বড় একজন শিল্পপতির সঙ্গেও একই কায়দায় প্রতারণা করা হয়েছে, যা পুরো ঘটনার ভয়াবহতাকে ফুটিয়ে তোলে। তবে এ বিষয়ে আবুল খায়ের লিটুর পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, ফেনীর বাসিন্দা মাসুদ উদ্দিন (চৌধুরী) জানিয়েছেন, তিনি এখন আইনি প্রক্রিয়ায় এই প্রতারণার বিচার ও অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এই প্রতারণা চক্রের শিকড় সন্ধানে অনুসন্ধানে নেমেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে অভিযুক্ত আবদুস সোবহানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি প্রতিবারই কল কেটে দেন। ফরিদপুরের এই ঘটনাটি দেশের তথাকথিত ‘পিলার ও কয়েন’ ব্যবসার আড়ালে থাকা সংঘবদ্ধ প্রতারণা চক্রের এক ভয়ংকর চিত্র সামনে নিয়ে এসেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, সঠিক তদন্ত ও দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এই ধরনের প্রতারক চক্র আরও অনেকের জীবন ধ্বংস করে দেবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আলোচিত

রূপগঞ্জে ‘আন্ডা রফিক’-এর সন্ত্রাস, জমি দখল ও অর্থপাচার দীর্ঘদিনের পলাতকতার শেষে নতুন উত্তেজনা

১০ পর্বের ১ম পর্ব *পিলার ও কয়েন চক্রের মূলহোতা ফরিদপুরের আওয়ামী নেতা আবদুস সোবহান*

আপডেট টাইম : ০৪:১২:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬

ফরিদপুর জেলা আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগের সভাপতি আবদুস সোবহানকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে চলছে কথিত ‘পিলার’ ও ‘কয়েন’ ব্যবসার রমরমা প্রতারণা ফাঁদ। অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলেও এই প্রতারক চক্রের মূলহোতা সোবহানের দাপট কমেনি। ভুয়া দলিল এবং প্রাচীন ও মূল্যবান ধাতব বস্তুর প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীর মালিকদের কাছ থেকে লাখ থেকে শুরু করে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। ভুক্তভোগীদের দাবি, সোবহান বিভিন্ন দুর্লভ কয়েন ও পিলার সদৃশ বস্তু দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করতেন। প্রচার করতেন, এসব বস্তু বিদেশি ক্রেতাদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করে বিপুল মুনাফা করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে এসব তথাকথিত মূল্যবান বস্তু ছিল সাধারণ হাতে তৈরি ধাতব দ্রব্য, যার কোনো বাজারমূল্য নেই। এই মরীচিকার পেছনে ছুটে এখন নিঃস্ব হওয়ার পথে অনেক পরিবার।

এই প্রতারণার জালে আটকা পড়া ভুক্তভোগীদের তালিকায় রয়েছেন রাজিয়া সুলতানা বেবী, কিচেন গ্রুপের মালিক এমএ কাদের, এনার্জিপ্যাকের মালিক এনামুল হক চৌধুরী (খসরু), মো. মঈন বিশ্বাস, বেঙ্গল গ্রুপের মালিক আবুল খায়ের লিটু এবং ফেনীর বাসিন্দা মাসুদ উদ্দিন (চৌধুরী)। অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, সোবহান একেকজন ভুক্তভোগীকে ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে ফাঁদে ফেলেছেন। কখনো এককালীন বড় অঙ্কের টাকা, আবার কখনো ধাপে ধাপে অর্থ আদায় করছেন। ভুক্তভোগীরা জানান, শুরুতে সোবহানের রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের ওপর ভরসা করে তারা বিশ্বাস করেছিলেন যে তিনি পণ্যগুলো সঠিক উপায়ে বাজারজাত করতে পারবেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও এবং বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও তিনি কোনো অর্থ ফেরত দেননি।

প্রতারণার এই আঘাত শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং কেড়ে নিয়েছে প্রাণও। ভুক্তভোগী রাজিয়া সুলতানা বেবীর পরিবার বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটে নিমজ্জিত। রাজিয়া জানান, এই বিশাল আর্থিক ক্ষতির মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে তার বাবা ইউনুছ তালুকদারের স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং পরবর্তীতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাদের পরিবারের দাবি, কয়েন ও পিলার ব্যবসার ফাঁদই তাদের পারিবার ধ্বংসের মূল কারণ।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও কিচেন গ্রুপের মালিক এমএ কাদের জানান, সোবহান তাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পিলার ও কয়েন বিক্রি করে লভ্যাংশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ব্যবসায়িক আস্থা ও তার রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করলেও এখন সোবহানের আর কোনো হদিস মিলছে না। তিনি তার মূল টাকাও ফেরত পাননি। একইভাবে এনার্জিপ্যাকের মালিক এনামুল হক চৌধুরী (খসরু) জানান, সোবহান নিজেকে একটি আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের অংশ হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং অতীতে সফল লেনদেনের মিথ্যা উদাহরণ দিতেন। এই মিথ্যে বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে লেনদেনে জড়িয়ে তিনি এখন প্রতারিত।

অন্য এক ভুক্তভোগী মো. মঈন বিশ্বাস জানান, শুরুতে সোবহান নিয়মিত যোগাযোগ রাখলেও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পর ধীরে ধীরে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এখন তিনি দেখছেন তার ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। অভিযোগের তালিকায় থাকা বেঙ্গল গ্রুপের মালিক আবুল খায়ের লিটুর বিষয়ে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, দেশের এত বড় একজন শিল্পপতির সঙ্গেও একই কায়দায় প্রতারণা করা হয়েছে, যা পুরো ঘটনার ভয়াবহতাকে ফুটিয়ে তোলে। তবে এ বিষয়ে আবুল খায়ের লিটুর পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, ফেনীর বাসিন্দা মাসুদ উদ্দিন (চৌধুরী) জানিয়েছেন, তিনি এখন আইনি প্রক্রিয়ায় এই প্রতারণার বিচার ও অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এই প্রতারণা চক্রের শিকড় সন্ধানে অনুসন্ধানে নেমেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে অভিযুক্ত আবদুস সোবহানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি প্রতিবারই কল কেটে দেন। ফরিদপুরের এই ঘটনাটি দেশের তথাকথিত ‘পিলার ও কয়েন’ ব্যবসার আড়ালে থাকা সংঘবদ্ধ প্রতারণা চক্রের এক ভয়ংকর চিত্র সামনে নিয়ে এসেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, সঠিক তদন্ত ও দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এই ধরনের প্রতারক চক্র আরও অনেকের জীবন ধ্বংস করে দেবে।