গাজীপুর, ২৩ অক্টোবর ২০২৬।
গাজীপুর প্রেসক্লাবের নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, অতীতের রাজনৈতিক ভূমিকা এবং পেশাগত নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অতীতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা কিছু ব্যক্তি এখনো সাংবাদিকতার পরিচয় ও সাংগঠনিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
সমালোচকদের প্রশ্ন—যাঁরা অতীতে ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রকাশে কতটা ভূমিকা রেখেছিলেন, তাঁদের রাজনৈতিক ও পেশাগত অতীত কি বর্তমান নির্বাচনের আলোচনায় যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে? সাংবাদিকতার পরিচয় কি জনস্বার্থে সত্য প্রকাশের জন্য, নাকি রাজনৈতিক যোগাযোগ ও ব্যক্তিগত সুবিধা ধরে রাখার মাধ্যম?
তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে নির্দিষ্ট ব্যক্তির সম্পৃক্ততা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। তাই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নথি, প্রকাশিত সংবাদ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাব গুরুত্বপূর্ণ।
অতীতের রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে জবাবদিহি কোথায়?
অভিযোগকারীদের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গাজীপুরে রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, মেয়র ও পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে কেন্দ্র করে কিছু সাংবাদিকের প্রভাব তৈরি হয়েছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে সমালোচকদের প্রশ্ন, ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাঁরা যতটা সক্রিয় ছিলেন, সাধারণ মানুষের অধিকারহরণ, প্রশাসনিক অনিয়ম কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশে কি ততটাই সক্রিয় ছিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর অনুমান দিয়ে নয়, কাজের রেকর্ড দিয়ে খুঁজতে হবে। অতীতের প্রকাশিত সংবাদ, সংশ্লিষ্ট ঘটনার প্রতিবেদন, ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকার এবং সরকারি নথি বিশ্লেষণ করলে বোঝা সম্ভব হবে—কে জনস্বার্থে কাজ করেছেন, আর কার ভূমিকা নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন রয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয় বদলালেই কি অতীতের প্রশ্ন শেষ?
রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পর কোনো ব্যক্তি নতুনভাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অতীতের পেশাগত ভূমিকা, সংবাদ প্রকাশের রেকর্ড এবং ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সম্পর্কের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক নয়।
সমালোচকদের অভিযোগ, অতীতে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কিছু ব্যক্তি বর্তমানে সাংবাদিকতার পরিচয় ও সংগঠনের নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে আগ্রহী। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে দেখতে হবে—তাঁরা কোনো অনিয়ম আড়াল করেছেন কি না, রাজনৈতিক চাপের মুখে সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থেকেছেন কি না এবং সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা নিয়েছেন কি না।
কেবল রাজনৈতিক পরিচয় বা কারও সঙ্গে ছবি থাকার ভিত্তিতে কাউকে দালাল বলা যায় না। কিন্তু প্রমাণসহ রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, সংবাদ দমন কিংবা অনৈতিক সুবিধা আদায়ের ঘটনা সামনে এলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।
সাংবাদিকতা, পরিচয়পত্র ও পেশাগত মান নিয়ে প্রশ্ন
সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র বিতরণ, সদস্যপদ এবং পেশাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। পরিচয়পত্র বা সদস্যপদকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেন, অনিয়ম কিংবা প্রতারণার অভিযোগ থাকলে তার লিখিত প্রমাণ সংগ্রহ করা জরুরি।
একইভাবে, প্রেসক্লাবের সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে গঠনতন্ত্র, স্বচ্ছ মানদণ্ড এবং যোগ্য সাংবাদিকদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, সেটিও পর্যালোচনার দাবি রাখে। সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক পরিচয় নয়; বরং সত্যনিষ্ঠা, তথ্য যাচাই, জনস্বার্থে প্রতিবেদন এবং পেশাগত নৈতিকতা।
নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের কাছে জনস্বার্থের প্রশ্ন
গাজীপুর প্রেসক্লাবের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের অতীত কাজ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ:
১. বিগত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব বা প্রশাসনিক চাপের বিরুদ্ধে তাঁদের প্রকাশিত সংবাদ ও পেশাগত ভূমিকার রেকর্ড কী?
২. কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অনিয়মের অভিযোগ সামনে এলে তাঁরা স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রকাশ করেছেন কি না?
৩. প্রেসক্লাবের সদস্যপদ, পরিচয়পত্র বিতরণ এবং আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তাঁদের পরিকল্পনা কী?
৪. রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে পেশাদার সাংবাদিকদের অংশগ্রহণ ও মতপ্রকাশের অধিকার কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
৫. সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে তদবির, সংবাদ গোপন বা ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠলে কী ধরনের জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর প্রার্থীদের কাছ থেকে প্রকাশ্যে পাওয়া গেলে ভোটাররা তাঁদের পেশাগত অবস্থান ও পরিকল্পনা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পেতে পারেন।
নাম প্রকাশের আগে নথি যাচাইয়ের উদ্যোগ
এই প্রতিবেদনের পরবর্তী পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম, পদবি, অতীতের সাংগঠনিক ভূমিকা, প্রকাশিত সংবাদ, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কের প্রাসঙ্গিক নথি এবং অভিযোগকারীদের বক্তব্য যাচাই করা হবে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তাঁকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগও দেওয়া হবে।
প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী বা রাজনৈতিক দালাল হিসেবে চিহ্নিত করা এই অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য নয়। বরং সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, হলে কারা জড়িত এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা যায়—সেটিই অনুসন্ধানের মূল বিষয়।
উপসংহার: প্রেসক্লাবের নেতৃত্বে চাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
গাজীপুর প্রেসক্লাবের নির্বাচন কেবল একটি কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া নয়; এটি সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং জনআস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত। অতীতের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে অভিযোগ থাকলে তা যাচাই করতে হবে, আর অভিযোগের মুখে থাকা ব্যক্তিদেরও নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ দিতে হবে।
সাংবাদিকতা কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে রক্ষা করা বা কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার হাতিয়ার হতে পারে না। সাংবাদিকতার পরিচয় তখনই মর্যাদাপূর্ণ হয়, যখন তা ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষের জন্য একই মানদণ্ডে সত্য তুলে ধরে।
দৈনিক কণ্ঠের অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে। অভিযোগ, নথি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যাচাই করে পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করা হবে।