সাবেক সচিব নজরুল ইসলামকে ঘিরে পদোন্নতি, সম্পদ অর্জন, সরকারি দপ্তরে প্রভাব বিস্তার, নিয়োগ-বদলি এবং রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় একদিনে চারটি পদোন্নতি পেয়ে সচিব হওয়ার ঘটনা থেকে শুরু করে তুষারধারা আবাসিক এলাকায় একাধিক ভবনের নির্মাণবিধি অনুসরণ, অনুমোদিত নকশা ও অকুপেন্সি সনদ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার হরিপুর গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলামের প্রশাসনিক উত্থান, কথিত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নিয়ে অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে। তাঁদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী বলয়ের মাধ্যমে সরকারি দপ্তরে প্রভাব বিস্তার, নিয়োগ ও পদায়নে সুবিধা গ্রহণ এবং সম্পদ অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এসব দাবির সত্যতা যাচাইয়ে পদোন্নতির আদেশ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, সম্পদ বিবরণী ও আর্থিক লেনদেনের নথি পর্যালোচনা জরুরি।
অভিযোগকারীদের দাবি, ৫ আগস্ট-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নজরুল ইসলাম একদিনে চারটি পদোন্নতি পেয়ে সচিব হন। এ পদোন্নতির প্রতিটি ধাপের তারিখ, পদ, গ্রেড ও প্রশাসনিক ভিত্তি কী ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আদেশ ও সরকারি নথি যাচাই করলেই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত তোফায়েলকে ঘিরেও নিয়োগ ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রোগ্রামার পদে তাঁর নিয়োগের যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া যাচাই করা দরকার। একইভাবে শিক্ষা ভবনের উন্নয়ন প্রকল্পের কর্মচারী কবির আহমেদের পদোন্নতি, রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তি এবং বুড়িচংয়ে পদায়ন নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব ক্ষেত্রে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পদ সৃষ্টির অনুমোদন ও বদলি-পদায়নের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
রাজধানীর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের তুষারধারা আবাসিক এলাকার ১০ নম্বর সেক্টরে ২৪ কাঠা জমির ওপর নির্মিত একটি বহুতল ভবনের সঙ্গে নজরুল ইসলামের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের অভিযোগ, ভবনটির নির্মাণে ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর), সেটব্যাক ও অন্যান্য প্রযোজ্য বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। নির্মাণাধীন অবস্থায় ভবনটি ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। তবে ভবনটির প্রকৃত মালিকানা, অনুমোদিত নকশা ও অকুপেন্সি সনদের তথ্য যাচাই ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
তুষারধারার ৯ নম্বর সেক্টরে বায়তুশ শরীয়ত মসজিদের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত ‘ফ্রেন্ডস ভিউ টাওয়ার’ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ২০২২ সালে রাজউক ভবনটিতে অভিযান চালিয়ে কিছু অংশ ভেঙে দেয় এবং মুচলেকার মাধ্যমে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করে। পরে আবার নির্মাণকাজ সম্পন্ন ও অকুপেন্সি সনদ ছাড়া ব্যবহার শুরুর অভিযোগ উঠেছে। রাজউকের অভিযান প্রতিবেদন, মুচলেকা, পরবর্তী অনুমোদন এবং ভবনটির বর্তমান অবস্থার নথি যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া তুষারধারার ৪ নম্বর সেক্টরের ‘মিশন সাগরিকা অ্যাপার্টমেন্ট’ নিয়ে মালিকানা বিরোধ ও নির্মাণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে ভবনটি নিয়ে রাজউক ও দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ করা হয়েছে। ২০১৯ ও ২০২২ সালের অভিযোগের পর জরিমানা, মুচলেকা এবং নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পার্কিংয়ের জায়গায় দোকান ও ফ্ল্যাট নির্মাণ এবং ফ্ল্যাট বিক্রির পর কাগজপত্র পরিবর্তনের অভিযোগও উঠেছে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অভিযোগের মূল কপি, অনুমোদিত নকশা, দলিল ও রাজউকের পরিদর্শন প্রতিবেদন পরীক্ষা করা জরুরি।
নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ওমর ফারুককে ধানমন্ডিতে সরকারি অফিসার্স কোয়ার্টার বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, বরাদ্দটি নিয়মবহির্ভূত ছিল। তবে এর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির চাকরির পদ, আবাসন বরাদ্দের যোগ্যতা, আবেদনপত্র ও অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করতে হবে।
অভিযোগকারীরা রফিক, তোফায়েল, মুমিন, হাবিব ও কাজী মামনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে সম্পদ অর্জন, ফ্ল্যাটের মালিকানা, নিয়োগে প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পদায়ন, বঙ্গবন্ধু ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি দেওয়ার নামে ১১ লাখ টাকা নেওয়া এবং বিভিন্ন এলাকায় প্লট, স্কুল ও হাসপাতালের মালিকানা অর্জনসংক্রান্ত অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। তবে এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে নিয়োগের নথি, সম্পদ বিবরণী, জমির দলিল, প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন এবং আর্থিক লেনদেন যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের দেওয়া তালিকায় কনটেক ডেভেলপার, ওয়ানল্যান্ড ডেভেলপার, কনফিডেন্স গ্রুপ, রোজ গার্ডেন অ্যাসোসিয়েশন, মিশন ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট, বুড়িচং পলিটেকনিক, বুড়িচং আধুনিক হাসপাতাল, বুড়িচং ওয়েলফেয়ার সোসাইটি, রওশন-সিরাজ ফাউন্ডেশন, মিশন শ্যামলিমা, মিশন লাইট হাউজ, মিশন গার্ডেন ঢাকা ও কনফিডেন্স সফটওয়্যারের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনোটি সম্পদ অর্জন, ডেভেলপার কার্যক্রম ও প্রশাসনিক সুবিধা গ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, মালিকানা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও সংশ্লিষ্ট ভবনের অনুমোদন আলাদাভাবে যাচাই না করে কোনো প্রতিষ্ঠানকে অবৈধ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত বলা যায় না।
সাবেক সচিব নজরুল ইসলামকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, রাজউক, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পদোন্নতি, নিয়োগ-পদায়ন, সরকারি আবাসন বরাদ্দ, ভবনের অনুমোদিত নকশা ও সম্পদ অর্জনের উৎস যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ফ্ল্যাট ক্রেতাদের অভিযোগও নিষ্পত্তি করা উচিত।
একজন সরকারি কর্মকর্তার পদোন্নতি কিংবা সম্পদের মালিকানা নিজে থেকেই অপরাধের প্রমাণ নয়। তবে অনিয়মের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। সাবেক সচিব নজরুল ইসলাম ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, সরকারি নথি এবং রাজউকের পরিদর্শন প্রতিবেদন যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র সামনে আনা জরুরি। জনস্বার্থে অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন অভিযোগকারীরা।চলবে